Views: 1009
নিজস্ব মতামত | এ. আর. ইমরান
ইশরাকের মতো তরুণ নেতৃত্বের ভুল হতে পারে, আবেগের বশে কখনো কখনো এমন কিছু সিদ্ধান্তও আসতে পারে, যা প্রচলিত আইন ও নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু একটি ভুলের জন্য একজন তরুণ নেতার সাহস, দেশপ্রেম, দলের প্রতি আনুগত্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিকতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা কতটা যুক্তিসংগত?
আমার বিশ্বাস, তরুণ নেতৃত্বের ভুল হলে তাদের একা ফেলে দেওয়া নয়, বরং পাশে দাঁড়িয়ে সঠিক পথ দেখানোই আমাদের দায়িত্ব। কারণ, ভুলকে সমর্থন করা আর একজন মানুষকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। আইন ভঙ্গের অভিযোগ থাকলে তার যথাযথ মূল্যায়ন অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু সেই সঙ্গে তার ইতিবাচক উদ্দেশ্য, সাহস এবং ভূমিকার দিকটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
মাদক আজ আমাদের সমাজের অন্যতম ভয়াবহ অভিশাপ। কত তরুণের স্বপ্ন ধ্বংস হচ্ছে, কত পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে, কত মা-বাবার বুক খালি হচ্ছে—তার হিসাব আমরা সবাই জানি। এমন বাস্তবতায় মাদকের বিরুদ্ধে কেউ সাহস নিয়ে মাঠে নামলে, সেই উদ্যোগকে উৎসাহিত করা উচিত। তবে মাদক নির্মূলের লড়াই হতে হবে আইনসম্মত, দায়িত্বশীল এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।
ইশরাকের ঘটনায় তাঁর লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র তাক করার বিষয়টি নিয়ে আইনগত প্রশ্ন উঠতেই পারে। বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেই যেকোনো পরিস্থিতিতে অস্ত্র তাক করার অধিকার তৈরি হয় না। এ বিষয়টি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ও অভিযানের উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা করাও জরুরি। আইনগত ভুলের সমালোচনা হোক, কিন্তু সেই সমালোচনা যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসটাকেই ধ্বংস করে না দেয়।
আমরা এমন রাজনীতি চাই না, যেখানে নেতারা শুধু নিরাপদ দূরত্বে থেকে বক্তব্য দেবেন, বিবৃতি দেবেন, অথচ বাস্তব সংকটে মাঠে নামার সাহস দেখাবেন না। আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যাদের ভেতরে আবেগ থাকবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকবে, মানুষের জন্য কিছু করার তীব্র তাগিদ থাকবে। কারণ, আবেগহীন রাজনীতি অনেক সময় কেবল হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে সেই আবেগকে হতে হবে বিবেক, প্রজ্ঞা ও আইনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত।
যে তরুণের মধ্যে দলের জন্য, দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ আছে, যে অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে চায়, যে মানুষের দুর্ভোগ দেখে নিশ্চুপ থাকতে পারে না—তাকে শুধুই ভুলের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শেষ করে দেওয়া কোনো দূরদর্শী রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না। বরং তাকে শেখাতে হবে, কীভাবে সাহসকে দায়িত্বশীলতায় রূপ দিতে হয়, কীভাবে আবেগকে সঠিক সিদ্ধান্তে পরিণত করতে হয় এবং কীভাবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকা যায়।
ইশরাকদের প্রয়োজন, তবে সেই সাহসের সঙ্গে চাই সংযম; আবেগের সঙ্গে চাই বিবেক; নেতৃত্বের সঙ্গে চাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।
আজ যদি আমরা তরুণ নেতৃত্বের প্রতিটি ভুলকে শুধুই ধ্বংসের হাতিয়ার বানাই, তাহলে আগামী দিনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস নিয়ে কে সামনে আসবে? আবার যদি ভুলকে প্রশ্রয় দিই, তাহলে নেতৃত্বের সঠিক বিকাশও হবে না। তাই আমাদের অবস্থান হতে হবে স্পষ্ট—ভুল হলে সংশোধন করতে হবে, আইন ভাঙলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, আর ভালো উদ্যোগ থাকলে তার স্বীকৃতিও দিতে হবে।
আমি বিশ্বাস করি, একটি দলকে শক্তিশালী করতে শুধু অভিজ্ঞ নেতাই যথেষ্ট নন; দরকার সাহসী, উদ্যমী ও দেশপ্রেমিক তরুণ নেতৃত্বও। যারা ভুল থেকে শিখবে, নিজেদের সংশোধন করবে এবং আরও দায়িত্বশীল হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবে।
ইশরাকদের থামিয়ে দেওয়া নয়, সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়া দরকার। তাদের সাহসকে নিভিয়ে দেওয়া নয়, সেই সাহসকে শৃঙ্খলা ও প্রজ্ঞার আলোয় আলোকিত করা দরকার।
কারণ, দেশের জন্য লড়াই করার সাহস যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই লড়াইকে সঠিক পথে পরিচালনা করার জ্ঞানও প্রয়োজন।
আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না, আবার আইনের সীমাও অতিক্রম করবে না। যারা দলের জন্য কাজ করবে, দেশের মানুষের জন্য কাজ করবে এবং নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসবে।
ইশরাকদের মতো তরুণ নেতৃত্বই আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—যদি তাদের সাহসকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া যায়।
সাহস বেঁচে থাকুক, আবেগ বেঁচে থাকুক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বেঁচে থাকুক—আর সেই প্রতিবাদ হোক আইনসম্মত, বিবেকনির্ভর ও দেশ গড়ার প্রত্যয়ে দৃঢ়।
তরুণ নেতৃত্বকে ধ্বংস নয়, গড়ে তুলুন। কারণ, আজকের সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া সাহসী তরুণই হতে পারে আগামী দিনের যোগ্য নেতা।
কমেন্ট বক্স